বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ
সৌর বিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব আনতে সহজলভ্য অর্থায়নের উপরও গুরুত্বারোপ করেছে সরকার
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৪-১১-২০২৬ ১০:৪৬:২৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৪-১১-২০২৬ ১০:৫০:৩৬ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
সৌর বিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব আনতে সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রণোদনার পাশাপাশি সহজলভ্য অর্থায়নের উপরও গুরুত্বারোপ করেছে সরকার।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’ এ আয়োজিত সেমিনারের সমাপনী দিনে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এ মন্তব্য করেন।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’ উদ্বোধন করেন।
চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সেমিনারগুলোতে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অর্থায়নকারী, শিল্পখাতের নেতৃবৃন্দ, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং উন্নয়ন সহযোগীরা একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন। "বাংলাদেশের সোলার বিপ্লবের জন্য নীতি, জনশক্তি ও মূলধন" শীর্ষক প্রতিপাদ্যে সেমিনারগুলো যৌথভাবে আয়োজন করে বিদ্যুৎ বিভাগ ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডকল)।
দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রদর্শনীর পাশাপাশি সোলার খাতের কৌশলগত উন্নয়ন, নীতিগত পরিবেশ এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে ‘Policy, People and Capital for Bangladesh’s Solar Revolution’ শীর্ষক মূল প্রতিপাদ্যের অধীনে চারটি বিশেষায়িত সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সেমিনারে প্যানেল আলোচকগণ গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
Powering the Future of Bangladesh: Pathways to a National Solar Revolution শীর্ষক সেমিনারে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল প্রাথমিক জ্বালানির জন্য বহিঃউৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল (২০২৬–২০৩০)-এর যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা ; সোলার সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ও কর-সুবিধা বহাল রাখা; সোলার সিস্টেমের ব্যয় এবং সার্ভিস প্রোভাইডার, ভোক্তা ও অর্থায়নকারীর জন্য এর সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা;ব্যাটারি স্টোরেজের ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিডের সক্ষমতা নিশ্চিত করা, যাতে বিঘ্ন ছাড়াই গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা যায়; দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে মান-যাচাইকৃত ও পরীক্ষিত সরঞ্জাম আমদানি নিশ্চিত করা।
Leading by Example: Scaling Rooftop Solar in Public Sector শীর্ষক সেমিনারের আলোচনায় উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর হলো রুফটপ সোলার স্থাপনের আগে সরকারি ভবনের নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি এবং কাঠামোগত নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন সম্পন্ন করা; OPEX মডেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যাতে সরকারি ভবনে বিনিয়োগ করতে পারে, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পেমেন্ট গ্যারান্টির ব্যবস্থা রাখা; স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের সময় সোলার সিস্টেম ও সেবাগ্রহীতা জনগনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ভালো কাঠামোগত নকশা, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তাসম্পন্ন ভবন ও প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া; নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ইত্যাদির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলা; রুফটপ সোলার কর্মসূচির ক্রয়প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা এবং স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো।
Domestic and Industrial Rooftop Solar: Ensuring Energy Security and Creating Employment শীর্ষক সেমিনারে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল সরকারের নীতি সহায়তাকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো; আমদানিকৃত সোলার সরঞ্জামের গুনগতমান নিশ্চিত করা; টেক্সটাইল খাতে অনলাইন IPS-এর বিকল্প হিসেবে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) ব্যবহারের সম্ভাবনা ও সুবিধা যাচাই করা; বিক্রয়োত্তর সেবা ও কারিগরি সক্ষমতা জোরদার করা;সৌরবিদ্যুতের জন্য গ্রিডকে প্রস্তুতি রাখা যার মধ্যে নেট মিটারিং সহজলভ্য করা অন্তর্ভুক্ত; প্রয়োজনীয় জনবল প্রস্তুত রাখা এবং সরকারের concessional financing সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
Financing the Solar Revolution: Unlocking Private Capital and Carbon Revenue শীর্ষক সেমিনারে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল সৌর বিদ্যুতে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে কর ও শুল্ক প্রণোদনা দেওয়; স্বল্প সুদের (কনসেশনাল) ঋণ এর পাশাপাশি স্থানীয় ও বৈদেশিক অর্থায়ন এবং গ্রিন বন্ডের সমন্বয় ঘটানো; প্রকল্পগুলো যাতে কার্বন ক্রেডিট থেকে আয় করতে পারে, সে জন্য কার্বন ক্রেডিট কাঠামো গড়ে তোলা;বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি জাতীয় হেজ ব্যবস্থা সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিবেচনা করা; তহবিল থাকা সত্ত্বেও জামানতসংক্রান্ত কঠোর বিধিবিধান সহজ করা; ক্রাউডফান্ডিংসহ বেসরকারি মূলধনের মাধ্যমে সোলারকে ব্যাংকেবল করে তোলা।
এ সকল সুপারিশ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা সেগুলো বাস্তবায়ন করার আশ্বাস প্রদান করা হয়। সৌর বিদ্যুৎ সম্প্রসারনের ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরনে সরকারের আন্তরিক বলে জানান বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ। সোলার এক্সপোতে অভুতপূর্ব সাড়া প্রদান করায় সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও ক্রতজ্ঞতা জানান বিদ্যুৎ সচিব। এ শুভ সূচনাকে চূড়ান্ত রুপ দিতে, এ খাতের বিপ্লব ঘটাতে আন্তরিকভাবে ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ এক্সপোতে ৮০টির বেশি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্যাভেলিয়ন ও ষ্টলের পাশাপাশি পাঁচ শতাধিক কনফারেন্স ডেলিগেট ও পাঁচ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক দর্শনার্থীর অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ এক্সপোতে সরকারি সংস্থা, দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করেন।
এক্সপোর মূল লক্ষ্য ছিল সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার উতসাহিত ও ত্বরান্বিত করা এবং এ খাতের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন, সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এতে ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, সৌরচালিত সেচব্যবস্থা, শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী অর্থায়নব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্টল ও প্যাভিলিয়নের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি, ইনভার্টার, ব্যাটারি, সোলার মডিউলসহ সংশ্লিষ্ট পণ্য ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং টেকসই নিম্ন-কার্বন অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে দেশি-বিদেশি সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজন স্পনসর হিসেবে যুক্ত হন। সমাপনি দিনে এক্সপোর স্পনসর ও স্টলে অংশ গ্রহনকারীদের হাতে পরিবেশ বান্ধব গাছ সম্মাননা স্মারক হিসেবে তুলে দেয়া হয়।
সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ আয়োজন সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলা স্কুপ /প্রতিবেদক /এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স